Ramadan / সিয়াম

প্রশ্নঃ ছিয়াম ও রামাদ্বান দ্বারা মূলত কি বুঝানো হয়েছে? রামাদ্বান মাসে ছিয়াম পালনের হুকূম কি?
উত্তরঃ প্রিয়বন্ধু! আস্-সালামু আলাইকুম। صيام (ছিয়াম) আরবী جمع (যামা) বা বহুবচনের শব্দ। এর واحد (অহিদ) বা একবচনে صوم (ছাওম) ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর আভিধানিক অর্থঃ বিরত থাকা, রোজা রাখা, উপবাস করা। ইসলামী শারীআতের পরিভায়ায়ঃ ছুবহু-ছ ছাদিক্ব তথা পূর্বাকাশের সাদা আভা প্রকাশিত হওয়া থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ে যাবতীয় খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ এবং যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকাকে ছাওম বলে।
আর رمضان(রামাদ্বান) শব্দটি আরবী رمض (রামদুন) শব্দমূল থেকে উদগত হয়েছে। যার আভিধানিক অর্থঃ দাহ, উত্তাপ, দহন। পরিভাষায়ঃ যে মাসে ছিয়াম উদ্যাপিত হয় ঐ মাসের নাম হচ্ছে رمضان (রামাদ্বান)। আর এ রামাদ্বান শব্দটি দ্বারা আরবী নবম মাসকে বুঝানো হয়েছে। আগুন জ্বালিয়ে রাশি রাশি কাষ্টকে যেমন ছাই বানিয়ে দেওয়া যায় তদ্রুপ রামাদ্বান মাসে ছিয়াম পালনের দ্বারাও মুমিনের বিগত জীবনের রাশি রাশি পাপকে নিঃশেষিত করা হয় সে কারণেই এ মাসটির নাম রামাদ্বান রাখা হয়েছে ।

রামাদ্বান মাসে ছিয়াম পালনের হুকূমঃ

রামাদ্বান মাসে ছিয়াম পালন করা উম্মাতে মুহাম্মাদীর প্রত্যেক বালিগ তথা প্রাপ্ত বয়সের অধিকারী নর-নারীর উপর ফারদ্ব বা একান্ত করণীয়। সে মতে সকল বালিগ মুসলমান এ মাসে অবশ্যই নিষ্ঠার সাথে ছিয়াম পালন করবে। যদি তারা তা না করে তাহলে নিশ্চিতই তা হারাম হবে। আর যদি তা অস্বীকার বশতঃ পরিহার করে তাহলে তা কুফরীর পর্যায়ে উন্নীত হবে। অর্থাৎ যারা ছিয়াম পালন করতে অস্বীকার করবে বা এর বিধানকে হেয় জ্ঞান করবে তারা নিশ্চিতই কাফির সাব্যস্ত হবে।
তবে যদি কেউ এ সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা মুসাফির তথা ৪৮ মাইলের বেশি দূরত্ব পথে পরিভ্রমণে বাহির হয় কিংবা কোন নারী ঋতুবতী হয়ে পড়ে এমতাবস্থায় ইসলামী শারীআতে তাদের ছিয়াম পালন না করার বিধান রাখা হয়েছে। অনুরূপভাবে গর্ভবতী এবং শিশু-সন্তানকে দুগ্ধ দানকারিণী যদি তার শিশু-সন্তানের ক্ষতির আশংকা করে তাহলে তাদের ক্ষেত্রেও ছিয়াম পালন না করার সুযোগ রয়েছে। তবে এ জাতীর লোকদের পরবর্তী সময়ে তাদের সে ভঙ্গিত ছিয়ামগুলো পূর্ণ করতে হবে। আর যদি কোন লোক অতিবৃদ্ধ হয়ে পড়ে যাদের সুস্থ হওয়ার আশা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে গেছে তাহলে তাদের পক্ষে ছিয়াম সাধনার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্য দিতে হবে। এর ব্যতিক্রম করা কারো পক্ষে কোন প্রকারেই বৈধ হবে না।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এভাবে তা বিবৃত হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ [١٨٣] أَيَّامًا مَعْدُودَاتٍ ۚ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۚ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ ۖ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ ۚ وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ ۖ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ [١٨٤] شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ يُرِيدُ اللّٰهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللّٰهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ [١٨٥]
হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য ছিয়ামের বিধান দেওয়া হল। এরূপ বিধান তো তোমাদের পূর্ববর্তীদেরও দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার। গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে অসুখে থাকবে অথবা সাফরে বের হবে, সে অন্য সময়ে তা পূরণ করে নিবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশির সাথে সৎকর্ম করে তা তার জন্য কল্যাণকরই হবে। আর যদি ছিয়াম পালন কর, তবে তোমাদের জন্য বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। রামাদ্বান মাসই হল সে মাস, যাতে নাঝীল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের ছিয়াম পালন করবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হিদায়াত দান করার দরুন আল্লাহ তাআলার মহাত্ম বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। (সূরাহ্-২, বাক্বারাহ্-১৮৩-১৮৫)
এ প্রসঙ্গে বিশ্বনাবী (ছা)-এর বাণী-
عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عُبَيْدِ اللهِ اَنْ اَعْرَابِيًا جَاءَ اِلَى رَسُوْلِ اللهِ ﷺ ثَائِرَ الرَّأْسِ فَقَالَ يَارَسُوْلَ اللهِ اَخْبِرْنِى مَاذَا فَرَضَ اللهُ عَلَىَّ مِنَ الصَّلَاوَةِ فَقَالَ الصَّلَوَتُ الْخَمْسُ اِلَّا اَنْ تَطَوَّعَ شَيْئًا فَقَالَ اخبرنى مَاذَا فَرَضَ اللهُ عَلَىَّ مِنَ الصِّيَامِ فَقَالَ شَهْرُ رَمَضَانَ اِلَّا اَنْ تَطَوَّعَ شَيْئًا فَقَالَ اخبرنى مَاذَا فَرَضَ اللهُ عَلَىَّ مِنَ الزَّكَاةِ فَقَالَ فَأَخْبَرَهُ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ شَرَائِعَ الْاِسْلَامِ قَالَ وَالَّذِى اَكْرَمَكَ بِالْحَقِّ لَا اَتَطَوَّعُ شَيْئًا وَلَا اَنْقُصُ مِمَّا فَرَضَ اللهُ عَلَىَّ شَيْئًا فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اَفْلَحَ اِنْ صَدَقَ اَوْ دَخَلَ الْجَنَّةَ اِنْ صَدَقَ
হাদ্বরাত ত্বালহাহ্ ইবনি উবায়দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত যে, এলোমেলো চুলসহ একজন গ্রাম্য আরব রাসূলুল্লাহ (ছা)-এর নিকট এলেন। তারপর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে বলুন, আল্লাহ তাআলা আমার উপর কত ছালাত ফারদ্ব করেছেন? তিনি বললেনঃ পাঁচ (ওয়াক্বত) ছালাত; তবে তুমি যদি কিছু নাফল আদায় কর তা স্বতন্ত্র কথা। এরপর তিনি বললেন, বলুন, আমার উপর কত ছিয়াম আল্লাহ তাআলা ফারদ্ব করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছা) বললেনঃ রামাদ্বান মাসের ছাওম; তবে তুমি যদি কিছু নাফল ছিয়াম আদায় কর তা হল স্বতন্ত্র কথা। এরপর তিনি বললেন, বলুন, আল্লাহ আমার উপর কি পরিমাণ ঝাকাত ফারদ্ব করেছেন? রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা) তাঁকে ইসলামের বিধান জানিয়ে দিলেন। এরপর তিনি বললেন, ঐ সত্তার ক্বাসম, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে সম্মানিত করেছেন, আল্লাহ আমার উপর যা ফারদ্ব করেছেন, আমি এর মাঝে কিছু বাড়াব না এবং কমাবও না। রাসূলুল্লাহ (ছা) বললেনঃ সে সত্য বলে থাকলে সফলতা লাভ করল কিংবা বলেছেন, সে সত্য বলে থাকলে যান্নাত লাভ করল। (বুখারী-১৭৭০, নাসায়ী-২০৯৪)
এ প্রসঙ্গে বিশ্বনাবী (ছা)-এর অন্য একটি বাণীঃ
عَنْ عَبْدِ اللهِ ابْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهـــُــــــــمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ بُنِىَ الْاِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ ، سَهَادَةُ اَنْ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ، وَاَقَامَ الصَّلَاةِ ، وَاِيْتَاءِ الزَّكَوةِ ، وَالْحَجِّ ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ –
হাদ্বরাত আব্দুল্লাহ ইবনি উমার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা) ইরশাদ করেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। ১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (ছা) আল্লাহ্র রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য দান ২. ছালাত ক্বায়িম করা ৩. ঝাকাত দেওয়া ৪. হায্য করা এবং ৫. রামাদ্বান-এর ছিয়াম পালন করা। (বুখারী-৭, মুসলিম-২১)

আশা করি আমরা বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হবেন। মহান আল্লাহ তাওফীক্ব দিন এবং যথাযথ মর্যাদায় ছিয়াম পালনের শক্তি দিন। আমীন।