নামাজে পাতেহার পর আমিন বলা।

প্রশ্নঃ ছালাত আদায়ে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ তিলাওয়াত শেষে “আমীন” সমস্বরে জোরে বলতে হবে? না আস্তে পড়তে হবে? নাকি না পড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে ?

উত্তরঃ প্রিয়বন্ধু! আস্-সালামু আলাইকুম। ছালাত আদায়ে সূরাহ্ ফাতিহাহ্ তিলাওয়াত শেষে “আমীন” সমস্বরে জোরে বলবে না; বরং আস্তে ও টেনে পড়তে হবে। আর তা না পড়েও কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে না। এ বারে দেখুন বিস্তারিত।

এ প্রসঙ্গে বুখারী শারীফে এসেছে-
হাদ্বরাত আবূ হুরায়রাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ছা) বলেছেনঃ ইমাম যখন ‘আমীন’ বলেন, তখন তোমরাও ‘আমীন’ বলো। কেননা, যার ‘আমীন’ (বলা) এবং ফিরিশতাদের ‘আমীন’ (বলা) এক হয়, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারী-৭৪৪) তিনি এখানে আরো একটি হাদীছ উল্লেখ করেছেন।

বুখারী শারীফের অত্র আহাদীছ মর্মে প্রমাণিত হয় যে, ছালাত আদায়ে ইমামের “ওয়া-লা-দ্ব দ্বাাল্লীন” বলার সময় সকলকে আমীন বলতে হবে। তবে সেটি সশব্দে, না নিঃশব্দে বলা হবে সে বিষয়ের উপর সরাসরি কোন বর্ণনা ‘হাদীছদ্বয়ের দ্বারা সনাক্ত করা যায় না। তবে যেহেতু ফিরিশতারা নিঃশব্দেই আমীন বলে থাকেন যা আমাদের কেউ টের পায় না। সুতরাং তাদের আমীন বলার সাথে আমীন বলা মিলাতে হলে বা একইরূপ হতে হলে আমাদের সশব্দে আমীন বলার কোন প্রশ্নই ওঠে না। দ্বিতীয়তঃ ফরজ ছালাতে তাকবীর বলা এবং ফাযর, মাগরিব ও ঈশায় ক্বিরআত ব্যতীত অন্য কিছুই যিহরী করা ইমাম এবং মুক্বতাদী কারো জন্যই বৈধ নয়। সুতরাং এ হাদীছ দ্বারা স্বাভাবিকভাবেই হকুম ছাবিত করে যে, আমীন সশব্দে বলতে হবে না।
তবে ইমাম বুখারী (রহ) এ ক্ষেত্রে যে অনুচ্ছেদটি দাঁড় করিয়েছেন তাতে সুস্পষ্টই মনে করা যায় যে, তিনি এর দ্বারা হয়তোবা সশব্দে আমীন বলার বিষয়টি উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। যেমন তা নিম্নরূপঃ
অনুচ্ছেদ ৫০২ঃ ইমামের সশব্দে ‘আমীন’ বলা। আত্বা (রহ) বলেন, ‘আমীন’ হল দুআ। তিনি আরও বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনি ঝুবাইর (রা) ও তাঁর পিছনের মুছুল্লীগণ এমনভাবে ‘আমীন’ বলতেন যে, মাসযিদে গুমগুম আওয়ায হতো। আবূ হুরায়রাহ্ (রা) ইমামকে ডেকে বলতেন, আমাকে ‘আমীন’ বলার সুযোগ থেকে বঞ্ছিত করবেন না। নাফি (রহ) বলেন, ইবনু উমার (রা) কখনই ‘আমীন’ বলা ছাড়তেন না এবং তিনি তাদের (আমীন বলার জন্য) উৎসাহিত করতেন। আমি তাঁর কাছ থেকে এ সম্পর্কে হাদীছ শুনেছি।
ইমাম বুখারী (রা‘হ)-এর এ অনুচ্ছেদ দ্বারা আমীন সশব্দে বলার বিষয়টি সুস্পষ্ট করে। তারই সাথে এটিও সুস্পষ্ট করে যে, আমীন হল দুআ বিশেষ। তবে এ ক্ষেত্রে যেটি লক্ষণীয় তাহল, প্রত্যেক ছালাতে অনেক দুআ পড়ার বিধান রয়েছে। তন্মেধ্যে কোন দুআই কিন্তু সশব্দে পড়া হয় না। দ্বিতীয়তঃ তাকবীর ও তিলাওয়াত ইমাম মহোদয়ই কেবল সশব্দে করেন অন্য কেউ নয়। এখানে মুক্বতাদীরা কেবল আমীন সরবে বলবেন কিনা তাঁর অনুচ্ছেদে সে কথাটি মোটেও আনা হয়নি। অন্যদিকে যদি মহিলারা ছালাতের যামাআতে উপস্থিত থাকে তাহলে তারা কিভাবে আমীন বলবে? সে বিষয়টিও এখানে স্পষ্ট করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমরা তো জানি যে, ইমাম মহোদয় ছালাতে ভুল করতে থাকলে তখনও কিন্তু তারা সরবে পুরুষের ন্যায় সুবহানাল্লাহ বলবে না; বরং তারা এ সময়ে তাসফীহ তথা হাততালি দিবে। দেখুন-(মুসলিম-৮৪৯)
কাজেই এখানে অস্পষ্টতা বিদ্যমান থাকায় অন্য হাদীসের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে মুসলিম শারীফে এসেছে-
অনুচ্ছেদ ১৮ঃ তাসমীদ, তাহমীদ ও আমীন সম্পর্কে।
হাদ্বরাত আবূ হুরায়রাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ছা) বলেনঃ ইমাম যখন ‘আমীন’ বলে, তোমরাও তখন ‘আমীন’ বল। কেননা যার আমীন বলা ফিরিশতাদের আমীন বলার সাথে মিলে যাবে তার পূর্বেকার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (মুসলিম- ৮১০) অনুরূপ তিনি আরো কয়েকখানা হাদীছ বর্ণনা করেছেন।
আমরা মুসলিম শারীফের এ সমস্ত বর্ণনা দ্বারাও আমীন সশব্দে বলার উপর সরাসরি কোন বর্ণনা দেখতে পাই না। কেননা- তাঁর অনুচ্ছেদে তিনটি বিষয়ের উল্লেখ আছে। এর তাআউ্উজ এবং তাসমিয়াহ্ ইমাম কিংবা মুক্তাদীর কাউকেই সশব্দে পড়তে হবে না বিভিন্ন হাদীছ মর্মে পৃথিবীর সকল আলিম একমত পোষণ করে থাকেন। আর অন্য দু‘টির বেলায় সুস্পষ্ট বর্ণনা না আসায় এখান থেকেও সিদ্ধান্ত স্থির করা গেল না।

এ প্রসঙ্গে তিরমিজি শারীফে এসেছে-
হাদ্বরাত ওয়াইল ইবনি হুযর (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (ছা)-কে غَيْرِ الَمَغٰضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالَيْنَ পাঠের পর “আমীন” বলতে শুনেছি। আর তিনি তা দীর্ঘ স্বরে পাঠ করেছেন। (তিরমিজি-২৪৮)
এ গ্রন্থের অন্য একটি হাদীছঃ হাদ্বরাত শুবা (রা) এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (ছা) غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالَيْنَ পাঠের পর আস্তে আমীন বলেছেন। (তরমিজি-২৪৯)
কাজেই অত্র গ্রন্থের বর্ণনাসমূহের দ্বারা আমরা এতটুকু নিশ্চিত হচ্ছি যে, আমীন আস্তে এবং মাদের সাথে অর্থাৎ টেনে পড়তে হবে। উচ্চস্বরে নয়।

এ প্রসঙ্গে নাসায়ী শারীফে বুখারী ও মুসলিম শারীফের মত বর্ণনা আসলেও সুনিশ্চিত কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে ইবনে মাযাহ-য় এসেছে-
হাদ্বরাত আবূ হুরায়রাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ লোকেরা আমীন বলা ছেড়ে দিয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ্ (ছা) যখন বলতেন: তখন তিনি বলতেনঃ আমীন। এমন কি প্রথম সারির লোকেরা তা শুনতে পেত এবং এতে মাসযিদ গুঞ্জরিত হতো। (ইবনু মাযাহ-৮৫৩)
এ কথার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রথমতঃ আমীন জোরে বলা হত এবং তখন মাসযিদ গুঞ্জরিত হত। এরপর আর আমীন জোরে বলা হত না। হাদ্বরাত আবূ হুরায়রাহ্ (রা) সে কথারই বর্ণনা দিয়েছেন। আর যদি এটি ত্রুটিপূর্ণ হত তাহলে তিনি নিঃসন্দেহে এ সমস্ত লোকদের প্রতি ক্ষোভে ফেঁটে পড়তেন এবং সকলকে তা উচ্চস্বরে পড়ার জন্য আদেশ বা উৎসাহিত করতেন। তিনি এমন কিছু করেছেন হাদীছ দ্বারা তাও কিন্তু প্রমাণিত হয় না। সুতরাং এটিই নিশ্চিত যে, হাদ্বরাত আবূ হুরায়রাহ্ (রা) কখনোই সুন্নাতের খিলাফ দেখে সহ্য করে নিতেন না।

এ প্রসঙ্গে আবূ দাউদ শারীফে বুখারী ও মুসলিম শারীফের মতের অনুরূপ হাদীছ এসেছে। তারি সাথে নিম্নোক্ত হাদীসখানা সকল মতের সমাধান দিতে যথেষ্ট গুরুত্ববহ। যথা-
হাদ্বরাত আবূ হুরায়রাহ্ (রা)-র চাচাত ভাই হাদ্বরাত আবূ আব্দুল্লাহ্ (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ছা) “গায়রি-ল মাগদ্বূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দাল্লীন” পাঠের পর এমন জোরে “আমীন বলতেন যে, প্রথম কাতারের তাঁর নিকটবর্তী লোক এ শব্দ শুনতে পেত। (আবূ দাঊদ-৯৩৪)
অত্র হাদীছখানা দ্বারা বিশ্বনাবী (ছা)-এর আমলে আমীন বলার স্বর উচ্চগামী ছিল না; বরং নিম্নগামীই ছিল এ কথাই প্রমাণ করে। কেননা এ ‘হাদীছখানাতে “ حَتّٰى يَسْمَعَ مِنْ يَّلِيْهِ এমনকি তাঁর পার্শস্ত ব্যক্তি তা শুনতে পেত।” বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর এটি মৃদুস্বরে বললে নিহায়াত তার পার্শস্ত ব্যক্তি শুনতে পাওয়ারই কথা।

এবারে আমরা অন্য কিছু প্রমাণের দিকে দৃষ্টি প্রদান করবো। আর তা হচ্ছেঃ
১. হাদ্বরাত উমার ইবনু-ল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন,
أربع يخفيهن الامام : التعوذ وبسم الله الرحمن الرحيم وامين واللهم ربنا ولك الحمد-
চারটি বিষয় ইমাম অনুচ্চস্বরে পাঠ করবে; আউজু বিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আমীন ও আল্লাহুম্মা রাববানা ওয়া লাকা-ল হামদ।
(ইবনি যারীর, কানঝুল ‘উম্মাল ৮/২৭৪; বিনায়াহ ২/২১৯৯)
২. হাদ্বরাত আবূ ওয়াইল (রহ) বলেন,
كان على وعبد الله لايجهران ببسم الله الرحمن الرحيم ولا بالتعوذ ، ولا بالتأمين ، قال الشيثمى : رواه الطبرانى فى الكبير وفيه أبو سعد البقال ، وهو ثقة مدلس –
খালীফায়ে রাশিদ হাদ্বরাত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও হাদ্বরাত আব্দুল্লাহ ইবনি মাসউদ (রা) বিসমিল্লাহ উঁচু আওয়াজে পড়তেন না। তেমনই আউজু বিল্লাহ এবং আমীনও। (আল-মুযামু-ল কাবীর, হাদীছ: ৯৪০৪; মাযমাউ-ঝ ঝাওয়াইদ ২/১০৮)
পরিশেষে আমরা এটিই স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, সূরাহ্ ফাতিহাহ্ তিলাওয়াত কালে ইমাম মহোদয়ের “ওয়া-লা-দ্ব দ্বাাল্লীন” উচ্চারণের পর মুছাল্লীগণ “আামীন” উচ্চস্বরে বলবে না।